গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম দফায় মুক্তি পেলো ৬৪ জন। হামাস - ইজরায়েলের পালটা হুমকি। আন্তর্জাতিক ডেস্ক |

কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় গাজায় শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া ইসরাইল ও হামাসের মাঝে চারদিনের (সোমবার পর্যন্ত) যুদ্ধবিরতি ও বন্দী-বিনিময়ের প্রথম দফায় সেদিনই হামাস ১৩ জন ইসরাইলি, ১১ জন থাই ও ১ জন ফিলিপিনোকে আর গতকাল (শনিবার) ইসরাইল ৩৯ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দিয়েছে। মুক্ত ইসরাইলিদের মাঝে ২, , ৬ ও ৯ বছরের ৪টি শিশু ও ৮৫ বছর বয়সিনী এক বৃদ্ধা রয়েছেন। আর মুক্ত ফিলিস্তিনিদের মাঝে ২৪ জন নারী ও ১৫ জন কিশোর রয়েছেন। ইসরাইলের তৈরি করা ৩০০ জন নারী ও শিশুর একটি তালিকা থেকে এদের বেছে নেওয়া হয়।

হামাসের হাতে থাই আরও ২০ জন নাগরিক বন্দী আছেন বলে জানিয়েছে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের সাথে মানবিক ব্যবহার করা হবে এবং তাদেরকে জলদি মুক্তি দেওয়া হবে বলে আশা করছেন তারা। পাশাপাশি তারা জানিয়েছেন - মুক্ত থাইরা ৪৮ ঘণ্টা হাসপাতালে থাকার পর দেশে ফিরে যাবেন।

অস্থায়ী এ যুদ্ধবিরতি চলাকালে চুক্তি মোতাবেক, মোট ৫০ জন ইসরাইলিকে মুক্তি দেবে হামাস। বিনিময়ে ইসরাইল মুক্তি দেবে ১৫০ জন ফিলিস্তিনিকে।

শুক্রবার সকালেই ২০০টি ট্রাক মিশর থেকে রাফা ক্রসিং দিয়ে গাজায় প্রবেশ করেছে। এগুলো চিকিৎসা সামগ্রী, জ্বালানি, রান্নার গ্যাস, পানিসহ খাদ্য-সামগ্রী ছিল বলে জানা গেছে। চুক্তি মোতাবেক, গাজায় প্রতিদিন ৪ ট্রাক জ্বালানি ও রান্নার গ্যাস ঢোকার অনুমতি পাবে। এছাড়া, মিশর থেকে গাজায় প্রতিদিন ২০০ ট্রাক ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী আনা হবে।

রেড ক্রস মুক্ত ইসরাইলিদেরকে গাজা থেকে প্রথমে রাফাহ ক্রসিং দিয়ে মিশরে নিয়ে গিয়ে ওখানকার একটি হাসপাতালে মেডিকেল চেকআপ করিয়ে হেলিকপ্টারে করে ইসরাইলে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, মুক্ত ফিলিস্তিনিদেরকে পশ্চিম তীরের রামাল্লাহর কাছে বেইতুনিয়া চেকপয়েন্টে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এখান থেকে তারা নিজ নিজ বাড়ীতে ফিরে যেতে পারবেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষ।

একটি বাস মুক্ত ফিলিস্তিনিদেরকে বহন করে গন্তব্যে নিয়ে যায়। পথে দু‘পাশে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিরা উল্লাসে ফেটে পড়েন! তখন বাসটির জানালা দিয়ে দেখা যায় - মুক্ত কিছু ফিলিস্তিনি নাচছেন। একজন গায়ে ফিলিস্তিনি পতাকা জড়িয়ে রেখেছেন। বাইরে জনতা মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তোলার পাশাপাশি আল্লাহু আকবরবলে আওয়াজ তুলছিল। তাদের কয়েকজন হামাসের পতাকাও দোলায়। ভয়াবহ একটি যুদ্ধের ভেতরে বিজয় উদযাপনের একটি মুহূর্ত তৈরি হয়!

মুক্ত ইসরাইলিরা ফেরার পর, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন: এখন আমাদের জিম্মিদের মাঝে প্রথম কয়েকজনকে ফিরিয়ে এনেছি আমরা। শিশু, তাদের মা ও অন্য নারীরা ফিরে এসেছে। তাদের প্রত্যেকে এক একটি পুরো বিশ্ব। কিন্তু আমি এই পরিবারগুলোকে ও আপনাদেরকে তথা ইসরাইলের সব নাগরিককে জোর দিয়ে বলছি যে, আমরা আমাদের সব জিম্মিকে ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুত।

উল্লেখ্য, হানাদার ইসরাইলের দীর্ঘদিনের অপরিসীম জুলুমের জবাবে গত ৭ই অক্টোবর গাজার সীমান্ত সংলগ্ন ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের নজিরবিহীন হামলা সবাইকে হতবাক করে দেয়! আর তাতে ১,২০০ জন ইসরাইলি নিহত হয়; যদিও প্রথমদিকে ইসরাইল জানিয়েছিল – ঐ নিহতের সংখ্যা ১,৪০০। এদের অধিকাংশকে ইসরাইলি, পাশ্চাত্ত্য ও ভারতীয় মিডিয়াগুলো বেসামরিক নাগরিক বলে প্রচার করলেও, বাস্তবতা হচ্ছে – ইসলাইল কর্তৃপক্ষ  ইসরাইলে তাদের যে কোনো নাগরিককে অস্ত্র বহনের অনুমতি দিয়েছে অনেক আগেই! ফলে, তারা বেসামরিক হয় কী করে? সেদিন প্রায় ২৪০ জনকে বন্দী করে গাজায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে হামাস। এরপর মাত্র ৫ জন মুক্তি পেয়েছিল।

হামাসের হামলার প্রতিশোধ নিতে প্রায় সবদিক থেকে গাজা অবরুদ্ধ করে ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে ইসরাইল। তাদের অবিরাম বোমাবর্ষণ ও গোলা হামলায় গাজাবাসী ফিলিস্তিনিদের মাঝে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার নিহত ও  ৩৩ হাজারের বেশী আহত হয়েছেন। নিহত ফিলিস্তিনিদের মাঝে ৬ হাজারের বেশী শিশু ও প্রায় ৪,০০০ জন নারী! এছাড়া, প্রায় ৭,০০০ ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন

আল-জাজিরা জানিয়েছে, গাজার সরকারী মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ৭ই অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন – যাদের মাঝে ৭ জন নারী সাংবাদিকও রয়েছেন। তারা নিজেদের অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে এ সাংবাদিকদের নাম ও ছবি প্রকাশ করেছেন এবং তাদেরকে সত্যের শহীদবলে অভিহিত করেছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট বলেছেন: চার দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি শেষ হবার পর, গাজায় আবার হামলা চালানো হবে। আরও অন্তত দু’ মাস হামাসের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চালিয়ে যাবে ইসরাইলের বাহিনী। এটি সাময়িক বিরতি। বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ নেই। এ বিরতিতে সেনাদের প্রস্তুতি নিতে, তদন্ত করতে, আরও অস্ত্র সরবরাহ করতে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরী হতে হবে। জলদি আবার মাঠে নামতে হবে। হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয়নি। যুদ্ধ চলমান একটি প্রক্রিয়া। আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে চাই। কেননা, শুধু চাপ প্রয়োগের জেরেই জিম্মিরা আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। 

আরও পড়ুন: তালেবান শাসনে আফিম চাষ কমেছে ৯৫%: জাতিসংঘ

অন্যদিকে, শুক্রবার হামাসের শীর্ষ নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন: প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। দখলদার ইহুদিবাদী শত্রু ইসরাইল বাজি ধরেছিল যে, বন্দুকের জোরে গণহত্যা চালিয়ে তাদের বন্দীদেরকে তারা মুক্ত করতে পারবে। কিন্তু প্রায় ৫০ দিন পর তারা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শর্ত মেনে তাদের বন্দীদেরকে মুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। হামাসের দেয়া শর্তেই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে তেল আবিব। চার দিনের যুদ্ধবিরতি শেষ হবার পর, ইসরাইলের সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হামাস পুরো প্রস্তুত রয়েছে। হামাস গাজা উপত্যকায় নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না আর যুদ্ধ শেষ হলে এই উপত্যকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ব্যাপারে কোনো বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপও মেনে নেবে না। ইহুদিবাদী ইসরাইল যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি ও বন্দী বিনিময় চুক্তি মেনে চলবে, ততক্ষণ প্রতিরোধ যোদ্ধারাও চুক্তির প্রতি অবিচল থাকবে। গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিরা গত সাত সপ্তাহ ধরে যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, সেজন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয় তাদের জন্যে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করায় কাতার ও মিশরকে ধন্যবাদ। গাজাবাসীর সমর্থনে লড়াই করায় লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

সূত্র: আল-জাজিরা, এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, প্রেসটিভি, সিনহুয়া ইত্যাদি।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করুন (0)

নবীনতর পূর্বতন